যুদ্ধের দামামা ও ভীষ্মের সিংহনাদ
গীতার প্রথম অধ্যায়, দ্বাদশ শ্লোক
এতক্ষণ আমরা দেখছিলাম দুর্যোধন একের পর এক কথা বলে যাচ্ছেন—কখনও গুরুকে খোঁচা দিচ্ছেন, কখনও নিজের দলের প্রশংসা করছেন, আবার কখনও বা ভয়ের কারণে স্ট্র্যাটেজি বদলাচ্ছেন।
কিন্তু অভিজ্ঞ পিতামহ ভীষ্ম আর চুপ থাকতে পারলেন না। তিনি দুর্যোধনের মনের ভয় বুঝতে পারলেন। তাই কথা দিয়ে নয়, তিনি উত্তর দিলেন একটি প্রচণ্ড শব্দের মাধ্যমে, যা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনা ঘোষণা করল।
গীতার বানী: শ্লোক ও সরল অর্থ
"তস্য সংজনয়ন্হর্ষং কুরুবৃদ্ধঃ পিতামহঃ ।
সিংহনাদং বিনদ্যোচ্চৈঃ শঙ্খং দধ্মৌ প্রতাপবান্ ।।"
(শ্রীমদ্ভাগবদগীতা ১/১২)
সরল বাংলা ভাবার্থ: তখন কুরুবংশের বয়োজ্যেষ্ঠ, প্রতাপশালী পিতামহ ভীষ্ম, দুর্যোধনের মনে হর্ষ (আনন্দ) উৎপাদনের জন্য সিংহের গর্জনের ন্যায় উচ্চস্বরে শঙ্খ বাজালেন।
গভীর বিশ্লেষণ: পিতামহের বার্তা
ভীষ্মের এই শঙ্খ বাজানোর পেছনে তিনটি গভীর উদ্দেশ্য ছিল:
১. দুর্যোধনকে সাহস দেওয়া
দুর্যোধন কথা বলছিলেন ভয়ের কারণে। পিতামহ ভীষ্ম পরিবারের সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে নাতি দুর্যোধনের এই নার্ভাসনেস বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তিনি শঙ্খ বাজিয়ে দুর্যোধনকে বোঝালেন—"ভয় পেও না, আমি এখনো বেঁচে আছি এবং আমি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।"
২. সিংহনাদ (চ্যালেঞ্জ)
শ্লোকে ভীষ্মের শব্দকে 'সিংহনাদ' (সিংহের গর্জন) বলা হয়েছে। সিংহ যেমন গর্জনের মাধ্যমে নিজের উপস্থিত জানান দেয়, ভীষ্মও তেমনি পাণ্ডবদের জানিয়ে দিলেন যে, কৌরব পক্ষ দুর্বল নয়। এটি ছিল বিপক্ষকে সরাসরি যুদ্ধের চ্যালেঞ্জ।
৩. কর্মের শুরু
এতক্ষণ শুধু কথাবার্তা ও কূটনীতি চলছিল। শঙ্খ বাজিয়ে ভীষ্ম বোঝালেন, "কথার সময় শেষ, এবার কাজের (যুদ্ধের) সময় শুরু।" তিনি সেনাপতি হিসেবে যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে দিলেন।
আমাদের জীবনে এই শিক্ষার প্রয়োগ
ভীষ্ম জানতেন অধর্মের জয় হবে না, তবুও তিনি তাঁর কর্তব্য পালন করলেন।
কাজের মাধ্যমে উত্তর দিন:
ভীষ্ম দুর্যোধনের কথার কোনো মৌখিক উত্তর দেননি। তিনি সরাসরি শঙ্খ বাজিয়ে কাজে নেমে পড়লেন। জীবনে যখন চারপাশের পরিস্থিতি হতাশাজনক হয় বা মানুষ অনেক কথা বলে, তখন চুপচাপ নিজের দক্ষতার প্রদর্শন করাই হলো শ্রেষ্ঠ উত্তর।
No comments:
Post a Comment